আগুনের কাছে গেলে গরম লাগে, সরে এলে ঠান্ডা। সূর্যের বেলায় কিন্তু ঘটে উল্টোটা।
সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার বাইরের পাতলা বায়ুমণ্ডলের নাম করোনা। সেই করোনার তাপমাত্রা ১০ লাখ ডিগ্রিও ছাড়িয়ে যেতে পারে। মানে পৃষ্ঠের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। এই বাড়তি শক্তি কোথা থেকে আসে, বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে তার উত্তর খুঁজছেন।
এবার চিনের একদল গবেষক ল্যাবে এমন একটা প্রক্রিয়া দেখিয়েছেন, যা এই তাপের কিছুটা ব্যাখ্যা করতে পারে। গবেষণাটি ছাপা হয়েছে ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস পত্রিকায়।
সূর্য ভরা প্লাজমা (plasma) দিয়ে। প্লাজমা হলো পদার্থের এমন এক অবস্থা, যেখানে কণাগুলো বৈদ্যুতিক চার্জ বহন করে। এই প্লাজমার ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে থাকে চৌম্বকক্ষেত্র।
উল্টো দিকে মুখ করা দুটো চৌম্বকক্ষেত্র কাছাকাছি এলে তাদের সংযোগ বদলে যেতে পারে। তখন জমে থাকা শক্তি ছাড়া পায়। সেই শক্তিতে কণাগুলো গরম হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ার নাম চৌম্বক পুনঃসংযোগ (ম্যাগনেটিক রিকানেকশন)।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, সূর্যে অসংখ্য খুব ছোট ছোট শিখা জ্বলে ওঠে। এদের বলে ন্যানোফ্লেয়ার (nanoflare)। সব মিলিয়ে এরা হয়তো করোনাকে গরম রাখতে সাহায্য করে। এমন কিছু ছোট বিস্ফোরণ কীভাবে শুরু হতে পারে, নতুন গবেষণা তারই একটা সম্ভাব্য কারণ পরীক্ষা করেছে।
গবেষকদের দলে ছিলেন চায়না ইনস্টিটিউট অব অ্যাটমিক এনার্জির ওয়েই সুন এবং বেইজিং নর্মাল ইউনিভার্সিটির ইয়ংলি পিং-সহ আরও কয়েকজন। তাঁরা কাজ করেছেন সাংহাইয়ের শেনগুয়াং-২ লেজার কেন্দ্রে।
একটা প্লাস্টিকের টুকরোর গায়ে খুব সূক্ষ্ম ঢেউ কাটা ছিল। তাতে একসঙ্গে ৪টি লেজার রশ্মি ছোড়া হয়। প্রতিটি ঝলক টিকেছিল এক সেকেন্ডের ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগ সময়। তাতেই প্লাস্টিকের উপাদান কয়েক মিলিমিটারের একটা প্লাজমায় বদলে যায়। মাপে মোটামুটি একটা চালের দানার মতো।
এই প্লাজমা চারপাশের অনেক পাতলা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে আর গতি হারায়। তখন সীমানার ঢেউগুলো বেড়ে আঙুল আর ব্যাঙের ছাতার মতো আকার নেয়। এই আচরণকে বলে র্যালে-টেলর অস্থিরতা (Rayleigh–Taylor instability)।
প্লাজমা নিজেই প্রতিটি আঙুলের চারপাশে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করে। পাশাপাশি দুটো আঙুলের ক্ষেত্র থাকে উল্টো দিকে। কম্পিউটারে হিসাব কষে ঘটনাটা নকল করে দেখা হয়েছে, যাকে বলে সিমুলেশন (simulation)। তাতে দেখা গেছে, আঙুলগুলো বাড়তে বাড়তে চৌম্বকক্ষেত্রকে কাছে টেনে আনে। তখন ক্ষেত্রগুলো নতুন করে জুড়ে যায় আর আশপাশের প্লাজমা গরম হয়।
তুলনার জন্য গবেষকেরা একই পরীক্ষা সমতল প্লাস্টিক দিয়েও করেছেন। তাতে প্লাজমা মসৃণভাবে বয়ে যায়। আঙুলের মতো কাঠামো তৈরি হয় না।
প্লাজমা থেকে বেরোনো এক্স-রে বিশ্লেষণ করে তাঁরা ইলেকট্রনের তাপমাত্রা আন্দাজ করেছেন। ইলেকট্রন হলো প্লাজমার ভেতরের ঋণাত্মক চার্জের কণা। ঢেউখেলানো প্লাস্টিকে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। সমতল প্লাস্টিকে তা ছিল এর প্রায় অর্ধেক।
আরেকটা সিমুলেশনে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরিই হতে দেওয়া হয়নি। তাতে বাড়তি তাপের বেশিরভাগটাই উধাও হয়ে যায়। এটা ইঙ্গিত দেয় যে বাড়তি তাপের পেছনে চৌম্বকক্ষেত্রের ভূমিকা আছে।
সূর্যেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তুলনামূলক ঠান্ডা আর ঘন প্লাজমা মাঝে মাঝে চারপাশের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে নিচে নেমে আসে। একে বলে করোনার বৃষ্টি (coronal rain)। এই নেমে আসার সীমানায় একই ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
সূর্যের এসব ঘটনা এত ছোট আর এত দ্রুত যে স্পষ্ট করে দেখা কঠিন। ল্যাবের এই পরীক্ষা সেগুলো খুঁটিয়ে দেখার একটা উপায় দিচ্ছে। কোন অবস্থায় চৌম্বকক্ষেত্র কাছে আসে, তা যাচাই করা যাবে। ছাড়া পাওয়া শক্তি প্লাজমাকে কতটা গরম করে, সেটাও মাপা যাবে।
ল্যাবের প্লাজমা সূর্যের ন্যানোফ্লেয়ারের চেয়ে অনেক বেশি ঘন ছিল। পুরো ঘটনাও ঘটেছে অনেক কম সময়ে। কোন দিকগুলো করোনার সঙ্গে মেলে, তা বুঝতে গবেষকেরা কিছু মূল ভৌত অনুপাত মিলিয়ে দেখেছেন। তবে সূর্যে যেভাবে চৌম্বক শক্তি ধীরে ধীরে জমে ওঠে, এই পরীক্ষায় তা পুরোপুরি তৈরি করা যায়নি।
পরের ধাপে দরকার সূর্যের আরও পর্যবেক্ষণ আর ল্যাবে আরও পরীক্ষা।
জেনে রাখা ভালো
- এটা ল্যাবের পরীক্ষা, সূর্যকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে এই ফল পাওয়া যায়নি। লেজার দিয়ে মাত্র কয়েক মিলিমিটারের প্লাজমা বানানো হয়েছিল, যা সত্যিকারের সৌর বিস্ফোরণ নয়।
- চৌম্বকক্ষেত্র জুড়ে গিয়ে প্লাজমা গরম হওয়ার প্রমাণের একটা বড় অংশ এসেছে কম্পিউটার সিমুলেশন থেকে। গবেষণাটা একটাই দলের করা, অন্য কোনো দল এখনও এটা আবার করে দেখেনি।
- সূর্যে এই প্রক্রিয়া কত ঘন ঘন হয় বা করোনাকে কতটা গরম করে, তা এখনও জানা যায়নি। তাই করোনার তাপের কত ভাগ এর থেকে আসে, তা বলা যাচ্ছে না।
- করোনা কেন এত গরম, সেই রহস্যের সমাধান এখনও হয়নি। এই গবেষণা শুধু একটা সম্ভাব্য উপায় দেখিয়েছে।
