স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

অস্ত্রোপচারের পরে মেলানোমা ফেরার ঝুঁকি কমানোর ইঙ্গিত দিল ব্যক্তিগত এমআরএনএ টিকা

অস্ত্রোপচারে টিউমার কেটে বাদ দিলেই সব সময় রোগ একেবারে ভালো হয়ে যায় না। শরীরে লুকিয়ে থাকা অল্প কিছু ক্যানসার কোষ থেকে রোগ আবার ফিরতে পারে। মেলানোমা নামের ত্বকের ক্যানসারে এই ভয় অনেক বেশি। রোগের এই ফিরে আসা ঠেকাতে একটি টিকা নিয়ে বড় ট্রায়ালের ফল এসেছে।

টিকাটির নাম ইন্টিসমেরান। দুই ওষুধ কোম্পানি, মডার্না আর মার্ক এটি বানিয়েছে । এটা ক্যানসার ঠেকানোর টিকা নয়। যাঁদের টিউমার অস্ত্রোপচারে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের রোগ যাতে না ফেরে, সেটাই এর লক্ষ্য। রোগীরা টিকার সঙ্গে পেমব্রোলিজুমাব নামের একটি ওষুধও পেয়েছেন। এটা ইমিউনোথেরাপির ওষুধ। মানে, এটা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসারের বিরুদ্ধে কাজে লাগায়। মেলানোমার চিকিৎসায় এটা আগে থেকেই ব্যবহার হয়।

কোম্পানি দুটির ঘোষণা অনুযায়ী, টিকা পাওয়া দলে ক্যানসার ফেরা বা মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪২% কম ছিল। দুই বছর পরে টিকা পাওয়া দলের প্রায় ৮২% রোগী ক্যানসারমুক্ত ছিলেন। শুধু ওষুধ পাওয়া দলে এই হার ছিল প্রায় ৭০%।

অন্যভাবে বললে, ১০০ জনের হিসাবে এক দলে প্রায় ৩০ জনের ক্যানসার ফিরেছে বা মৃত্যু হয়েছে। টিকা পাওয়া দলে সংখ্যাটা প্রায় ১৮। ব্রিসবেনের মেটার রিসার্চের ইমিউনোথেরাপি গবেষক ক্রিস্টেন র‍্যাডফোর্ড নেচারকে বলেছেন, ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের চোখে ১০% ঝুঁকি কমাও উল্লেখযোগ্য।

এটা ছিল তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল (ফেজ-৩)। অনুমোদনের আগে অনেক রোগীর ওপর এটাই শেষ বড় পরীক্ষা। ট্রায়ালের নাম INTerpath-001।

১৫৭টি কেন্দ্রে ১,১৩৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগী এতে অংশ নেন। সবার মাঝারি থেকে গুরুতর পর্যায়ের মেলানোমা ছিল। লটারির মতো করে তাঁদের দুই দলে ভাগ করা হয়। প্রতি তিনজনে দুজন পান টিকা আর পেমব্রোলিজুমাব। বাকিরা পান প্লাসিবো (নকল ওষুধ) আর পেমব্রোলিজুমাব।

রোগীদের প্রায় ২৫ মাস ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ট্রায়ালের নেতৃত্বে ছিলেন সিডনির মেলানোমা ইনস্টিটিউট অস্ট্রেলিয়ার ক্যানসার বিশেষজ্ঞ জর্জিনা লং। পুরো ফল ২৪ অক্টোবর মাদ্রিদে ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর মেডিক্যাল অনকোলজির সম্মেলনে পেশ করা হয়। তার দুদিন আগে তথ্য অনলাইনে ফাঁস হয়ে যায়। তখন কোম্পানিগুলো মূল ফল আগেই জানিয়ে দেয়।

প্রতিটি টিকা একজন রোগীর জন্য আলাদা করে বানানো। গবেষকেরা প্রথমে রোগীর টিউমারের নমুনা থেকে ডিএনএ (জীবের বংশগত নির্দেশিকা) পড়েন। খোঁজেন, ক্যানসার কোষে কোথায় কোথায় জিনগত বদল (মিউটেশন) ঘটেছে।

এই বদল থেকে কিছু বিশেষ প্রোটিন তৈরি হতে পারে। এগুলো ক্যানসার কোষকে সুস্থ কোষ থেকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে। এদের বলে নিওঅ্যান্টিজেন (neoantigen)।

সেই রোগীর নিওঅ্যান্টিজেন মিলিয়েই টিকা তৈরি হয়। টিকায় থাকে এমআরএনএ (mRNA), মানে প্রোটিন বানানোর জন্য কোষের কাছে পাঠানো লিখিত নির্দেশ। উদ্দেশ্য হলো, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা যেন এই চিহ্ন দেখে ক্যানসার কোষ চিনে নেয়। ব্যাপারটা অনেকটা দর্জির মাপে বানানো জামার মতো। একজনের জামা আরেকজনের গায়ে ঠিক বসে না।

জর্জিনা লং জানিয়েছেন, প্রায় ১৫ বছর আগে গুরুতর মেলানোমার রোগীরা সাধারণত কয়েক মাস বাঁচতেন। এখন লক্ষ্যভেদী ওষুধ বা ইমিউনোথেরাপিতে প্রায় ৫৫% রোগী কার্যত সেরে ওঠেন। লংয়ের মতে, এই টিকা-ওষুধের জুটি তাঁদের জন্য, যাঁদের অস্ত্রোপচারের পরে রোগ ফেরার আশঙ্কা থাকে। শুধু ইমিউনোথেরাপিতে যাঁদের কাজ হয় না, তাঁরাও এর লক্ষ্য।

নেচার লিখেছে, এটা হয়তো ক্যানসারের প্রথম অনুমোদিত এমআরএনএ টিকা হতে পারে। মেলানোমা বা অন্য কোনো ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়ে সিদ্ধান্তের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সিডনির সেন্টেনারি ইনস্টিটিউটের ক্যানসার জিনতত্ত্ববিদ জেসামি টিফেন ফলকে আশাব্যঞ্জক বলেছেন। তবে দুই বছরের পরে টিকা কতটা কাজ করে, তা সময়ই বলবে। তাঁর কথায়, ক্যানসার কোষ চিকিৎসার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে ফাঁকি দিতে পারে। কিছু রোগী টিকায় সাড়াও দেননি।

লংয়ের দল এখন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখবে, কারা এই চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি উপকার পান। রোগীদের আরও কয়েক বছর পর্যবেক্ষণ চলবে। তখন বোঝা যাবে, টিকা রোগীদের আয়ু বাড়ায় কি না।

জেনে রাখা ভালো

  • এটা ক্যানসার ঠেকানোর টিকা নয়। অস্ত্রোপচারের পরে মেলানোমা যাতে আবার না ফেরে, তার জন্য চিকিৎসা। ফলাফল শুধু মেলানোমার জন্য, ত্বকের অন্য ধরনের ক্যানসারে এটা পরীক্ষা করা হয়নি।
  • ৪২% কম ঝুঁকি একটা আপেক্ষিক হিসাব। দুই বছরে আসল পার্থক্য প্রায় ১২ শতাংশ-বিন্দু (৮২% বনাম ৭০%)। প্রথম ছয় মাসে টিকার কোনো বাড়তি সুফল দেখা যায়নি, সুফল দেখা গেছে তার পরে।
  • টিকা নিলে রোগীরা বেশিদিন বাঁচেন কি না, সেটা এখনও প্রমাণ হয়নি। টিকাটা এখনও কোনো দেশে অনুমোদনও পায়নি।
  • ফলাফল এখনও কোনো জার্নালে ছাপা হয়নি। এসেছে শুধু সম্মেলনের উপস্থাপনা আর কোম্পানির ঘোষণা থেকে। ট্রায়ালের খরচ দিয়েছে টিকা তৈরির দুই কোম্পানি, মডার্না আর মার্ক।
  • প্রায় সবারই কিছু না কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে, যেমন জ্বর, ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা, ক্লান্তি। প্রতি সাতজনে প্রায় একজনের গুরুতর সমস্যা হয়েছে, তবে শুধু ইমিউনোথেরাপির ওষুধ পাওয়া দলেও হার প্রায় একই ছিল।
  • প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা করে বানানো টিকা। তাই খরচ বেশি হবে, তৈরিতে সময়ও লাগবে।

সূত্র

শেয়ার করুন